মুহাম্মদ আল্-হেলাল
আমার আব্বার কৈশরে তাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রারম্ভিক সময় ব্রিটিশ সেনারা তাদের বাহিনীতে
যোগদানের জন্য বাড়ি থেকে নিয়ে যায়। আব্বা দাদার এক মাত্র ছেলে সন্তান। দাদা চাননি তার
একমাত্র ছেলে যুদ্ধবিগ্রহের পেশায় যুক্ত হোক। দাদার সম্পত্তি দেখভাল করার জন্য তিনি
আব্বাকে ব্রিটিশ সেনাদের থেকে ফেরৎ নিয়ে আসেন।
ইন্না, রাবি দুই বন্ধু পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করেছিলেন। ১৯৪৭ সালে ইন্ডিয়া পাকিস্তান
পৃথক হয়। ঐ বছরই কাশ্মীর কে কেন্দ্র দু'দেশের মধ্যে যুদ্ধ হয়। ১৯৬৫, ১৯৭১, ১৯৯৯ সর্বশেষ
২০২৫ সালসহ বেশ কয়েকবার দেশ দুটির মধ্যে যুদ্ধ হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনী মানেই ইন্ডিয়ান
সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধ। আর ইন্ডিয়ান সেনাবাহিনী মানেই পাকিস্তান আর চায়নার সাথে যুদ্ধ আছেই।
জানা যায় ইন্না যুদ্ধবিগ্রহ আর নতুন স্ত্রীর মহব্বতের কারণে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে
দিয়ে বাড়ি এসে কৃষি কাজ করেন। পরবর্তীতে ইন্না নিজ এলাকায় আরেকটি সরকারি চাকরিতে
যোগদান করেন। দুজনেই বর্তমান অবসর জীবন যাপন করেন তবে আর্থিক বিচারে রাবি থেকে ইন্না
ভালো আছেন।
সেনাবাহিনীর আর্থিক সুযোগ-সুবিধা কম, তা কিন্তু নয়। তবে সেনাবাহিনী তথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
থেকে অবসরে এসে বিশেষ করে যারা সৈনিক পদে যোগদান করেছিলেন তাদের অনেকেই বেশ আর্থিক
অসচ্ছলতার মধ্য দিয়ে জীবন যাপন করেন। অবশেষে বাধ্য হয়ে বেসরকারি নিরাপত্তা বাহিনীতে
যোগদান করেন। আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মিশনে যুদ্ধপরবর্তী কর্মসূচিতে
পাকিস্তান বা অন্য কোন দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লিডিং এ কাজ করলেও ভালো আর্থিক সুযোগ-
সুবিধা পান। কিন্তু দিন শেষে তাদের আর্থিক অনটনের মধ্য দিয়েই যেতে দেখা যায়।
ফেসবুক স্ক্রল করার সময় একটি বক্তব্য সামনে আসে। বক্তব্যটি হলো পৃথিবীর ধনীদের কাছ
থেকে গরীবদের কাছে সকল সম্পদ হস্তান্তর করলেও ঐ সম্পদ দক্ষতার অভাবেই অদক্ষরা ব্যয়
করে আর দক্ষদের হাতে পৌঁছে তারা আবার ধনী হয়ে যায়। অবসরে আসা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর
সদস্যদের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক খরচ ব্যবস্থাপনার অদক্ষতাকে বোধহয় কাঠগড়ায় দাঁড় করানো
যায় তাদের অভাব অনটনের কারন হিসাবে।
দেশের বহুল পরিচিত মুখ ভিপি নুরের ওপর রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পর অসংখ্যবার হামলা হয়েছে।
যখন যে সুযোগ পেয়েছে তখন সে ভিপি নুরের ওপর হামলা করছে। এটি যেন এক অঘোষিত নিয়মে
পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি এই বহুল পরিচিত মুখ "ভিপি নুরের ওপর সেনা-পুলিশের বর্বর হামলা" (২৯
আগস্ট ২০২৫; আমার দেশ অনলাইন) হয়েছে। যার ফলে ভিপি নুর এখন আশঙ্কাজনক অবস্থায়
রয়েছে। এধরনের হামলা আমাদের এই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। যদিও এরকম ঘটনা
নতুন নয়। সাম্প্রতিক বিগত সরকারের প্রায় ১৫ বছরে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের এদেশের
নাগরিকদের সাথে কৃত কর্মকাণ্ডেও রয়েছে আলোচনা সমালোচনা যেটি অনভিপ্রেত। এছাড়া ১৯৭১
সালে ৭ ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধুও সামরিক বাহিনীর উদ্দেশে বলেছিলেন এদেশের জনগণের টাকায়
কেনা বন্দুক এদেশের জনগণের বুকে তাক করার চেষ্টা করোনা। একটি প্রশ্ন বার বার এসে উপস্থিত
হয় ''এদেশের জনগণের টাকায় যাদের বেতন হয় তারা এদেশের জনগণের টাকায় কেনা বন্দুক কেন
এদেশের জনগণের দিকেই তাক করে?''
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সামরিক বিশেষজ্ঞদের দেওয়া মতামত থেকে বুঝা যায় ১৯৭১ সালে পাকিস্তান
বিভাজনের পর এদেশের সামরিক বাহিনী আর কোন দেশের সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। কেননা
আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র হয় অধিক শক্তিশালী অথবা যুদ্ধাংদেহী নয়। আমাদের উচিত সামরিক
বাহিনীকে হয় প্রতিবেশী রাষ্ট্রের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর ন্যায় অধিক শক্তিশালী করে তুলা না
হয় একেবারে পিস স্টেইট হয়ে যাওয়া।
বাংলাদেশের চারিদিকে যেসকল প্রতিবেশী রাষ্ট্র রয়েছে তাদের সাথে ধর্ম, রাষ্ট্রীয় ভাষা,
রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক দিয়ে রয়েছে অমিল। প্রতিবেশী কোন রাষ্ট্র আমাদের যুদ্ধ প্রতিদ্বন্দ্বী
নয় তবে যুদ্ধ থেকে আশঙ্কামুক্তও নয় কেননা ভৌগলিক দিক বিবেচনা করে এদেশকে দক্ষিণ
এশিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের ইজরাঈলের সাথে তুলনা করা যায়। ভাষা, ধর্ম, রাজনৈতিক মতাদর্শ কোন দিক
দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশী তো নয় বিশ্বের কোন দেশের সাথেই মিল নেই ইজরাঈলেরও। ইজরাইল
পরীক্ষিত বন্ধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিতে ভর করে সারাবছর যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিবেশী
কিংবা ভিন্ন মতাদর্শের সাথে। U.S. President Barack Obama and Israeli Prime Minister
Benjamin Netanyahu, allies who nonetheless have had a testy relationship, said
Wednesday that their two countries have an "unbreakable bond." (September 21, 2016;
VOA)
কিন্তু এদেশের ইজরাঈলের মতো কোন বন্ধু রাষ্ট্র নেই যার উপর ভর করতে পারে। তবে কোন রাষ্ট্র
আক্রমণ করলে পাশে দাঁড়ানোর মতো একটি বন্ধু রাষ্ট্র থাকা জরুরি। প্রাসঙ্গিক একটি কথা এখানে
বলতে হয়, সেটি হলো আফঘানিস্তানের রাজধানী কাবুলের একটি আন্তর্জাতিক যুব সম্মেলনে আমার
অংশগ্রহন করার সুযোগ হয়েছিল বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসাবে ২০১৭ সালে। এটির আয়োজনে ছিল
আফঘানিস্তান, ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জাতিসংঘ।
আয়োজনের মধ্যে কাবুলের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আমরা তিনজন পাকিস্তানের ইশতিয়াক
হুসাইন, ইন্ডিয়ার আফ্রোজ খান এবং আমি একটি ত্রিপাক্ষিক কথোপকথনে মিলিত হয়েছিলাম।
সেখানে ইশতিয়াক হুসাইন আমাকে বলছিলেন 'You are Blunder Nation'। আমি কিংকর্তব্যবিমূড়
হয়ে গেলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম what happened তিনি বললেন দেখ তোমরা অন্য রাষ্ট্রের
প্ররোচনায় পাকিস্তান থেকে পৃথক হয়ে গেছ। পাকিস্তানের এবং ইন্ডিয়ার এটোম বোম্ব আছে। এরা
নিজেরাই নিজেদের প্রতিরক্ষা করতে পারে তোমাদের কেউ আক্রমণ করলে না পাকিস্তান তোমাদের
জন্য এগিয়ে আসবে না ইন্ডিয়া। আমি প্রতি উত্তরে বলেছিলাম তোমাদেরও দোষ আছে। আফ্রোজ খান
বললেন you Bangladeshi people never get separated by yourselves rather we Indian
people did you এই আলোচনা চলতে ছিল। বোধ হয় আমরা তিনজনই পাঠ্যপুস্তক থেকে অর্জিত
জ্ঞান দিয়ে কথা বলছিলাম আমিতো বটেই। পরিতাপের বিষয় ইতিহাস তিন দেশের শিক্ষার্থীদের কাছে
তিনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। এছাড়াও আমাদের ইতিহাস বিভিন্নভাবে বিকৃতি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে
রাষ্ট্রের অনেক করনীয় রয়েছে বলে আমার মনে হয়।
আমরা স্নাতক শ্রেণীতে পড়ার সময় আমাদের একটি কোর্স ছিল Principal of Political Science
and the constitution of Bangladesh, USA, UK and India
কোর্সটির অধীনে বাংলাদেশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইন্ডিয়া সংবিধানের তুলনামূলক
আলোচনা পড়তে হয়েছিল। যতদূর মনে পড়ে ইন্ডিয়ার সংবিধানের একটি অংশে লেখা ছিল জাতির
প্রয়োজনে সামরিক বাহিনীর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করার এখতিয়ার রয়েছে। বাংলাদেশ
এবং পাকিস্তানের সংবিধান রয়েছে এই বিষয়ে বিপরীত মেরুতে কিন্তু বাস্তবতা দেশ তিনটির ক্ষেত্রে
সম্পূর্ণ উল্টো।
অল্পকিছু আগেও যে দেশের মানুষ পরিবারের সদস্যদের প্রতি মায়া-মমতা, যুদ্ধবিগ্রহের ভয় ইত্যাদি
কারণে সামরিক বাহিনীতে যোগদানের জন্য বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হলেও অভিভাবকরা ফিরিয়ে
আনতেন অথবা নিজেরাই ফিরে আসতেন। আজ সেই সকল চাকরি কোন ধরনের যুদ্ধবিগ্রহের ভয় না
থাকা, নানামুখি সুযোগ সুবিধা ইত্যাদি কারণে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা দিয়েও নিতে আগ্রহী এই দেশের
মানুষ। এই টাকাগুলো কে বা কারা গ্রহণ করে সেটি অবশ্যই তদন্ত হওয়াও জরুরি। অন্যদিকে বিভিন্ন
সময় খবরে প্রকাশ পায় ইজরাঈল, ইন্ডিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইত্যাদি দেশের সামরিক বাহিনীর
সদস্যদের যুদ্ধ করতে করতে হতাশ হয়ে আত্মহত্যার সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আমাদের দেশটিকে যদি পিস স্টেইট করা সম্ভব না হয় তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো বেশি
শক্তিশালী করতে কিছু সংস্কার করা যেতে পারে। যে দাবি ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহলে উঠছে।
সংস্কারের মধ্য উল্লেখযোগ্য হতে পারে:
১. সকল বাহিনীর সদর দপ্তর শুধু রাজধানী হওয়ার কারণে ঢাকায় নয় বরং কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ
স্থানে স্থানান্তর করা। সেক্ষেত্রে কৌশলগত কারণে বিজিবি সদর দপ্তর যশোর, নৌবাহিনী সদর
দপ্তর খুলনা এলাকায় স্থানান্তর করা যেতে পারে। এধরনের উদ্দ্যোগ দেশবাসীকে ঢাকার অসহনীয়
যানজট থেকেও মুক্তি দিবে। প্রাসঙ্গিক হওয়ায় বলতে হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদর দপ্তর ছাড়াও
ঢাকায় থাকা যৌক্তিক নয় এরকম যত কার্যালয় আছে যেমন বন বিভাগ, কৃষি বিভাগ, মৎস বিভাগ
ইত্যাদি সেগুলো তাদের স্বস্ব যৌক্তিক স্থানে স্থানান্তর করতে হবে।
২. জাতিসংঘ মিশনে যুদ্ধ পরবর্তী কর্মসূচিতে নয় বরং যুদ্ধ অবস্থায় প্রেরন করে প্রকৃত যুদ্ধে
অভিজ্ঞ করে তুলতে হবে সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। কেননা আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
জন্মের পর কোন যুদ্ধ করেনি।
৩. সকল দিক দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সুসজ্জিত এবং শক্তিশালী করতে হবে। বিশেষভাবে
পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হওয়ার জন্য এখনই কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
৪. আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আমাদের গৌরব। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে আমাদের বাহিনী অন্য দেশের
লিডিং এ নয় বরং লিডিং পজিশন গ্রহণ করতে পারে সে উদ্দ্যোগ নিতে।
৫. আমাদের বাহিনীর সদস্যদের কর্মমুখী দক্ষ করে তুলতে হবে যেন অবসরে অভাব অনটনের জন্য
বেসরকারি শৃঙ্খলা বাহিনীতে যোগদান করতে না হয়।
আমাদের শিশুদের দাঁত উঠলে তারা মা-বাবা, ভাইবোন, দাদাদাদি, চাচাচাচি, ফুফু, মামা, খালা ইত্যাদির
হাতে, কপালে, মুখে মাঝে মধ্যে আলতো করে কামড় দেয়। বড় হলে এই শিশুরা আবার তার সকল
আত্মীয়-স্বজনের নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। আমাদের শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও দেশের জনগণের
দিকে বন্দুক তাক নয় বরং বহিশত্রুর বন্দুক থেকে নিরিপত্তায় কাজ করবে ইনশাআল্লাহ।

এমফিল গবেষক(এবিডি)
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
alhelaljudu@gmail.com
+8801782524223

