সত্যজিৎ দাস (মৌলভীবাজার প্রতিনিধি):
মৌলভীবাজার জেলার মৌলভীবাজার-৪ সংসদীয় আসনটি এবার ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি। শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী থাকা আওয়ামী লীগ নির্বাচনের মাঠে না থাকায় রাজনীতির চিরচেনা সমীকরণ ভেঙে পড়েছে। ফলে ভোটের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাবে-তা নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র প্রতিযোগিতা।
সংখ্যালঘু ও চা শ্রমিক ভোটে নির্ভরশীল এই আসনে বিএনপির ভেতরকার দ্বন্দ্ব এবং একাধিক দলের সক্রিয়তায় নির্বাচন ঘিরে তৈরি হয়েছে বাড়তি উত্তেজনা।
মৌলভীবাজার-৪ আসনের ভোট কাঠামো জেলার অন্যান্য আসনের তুলনায় আলাদা। এখানে মোট ভোটারের প্রায় ৪০ শতাংশ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। এর মধ্যে আবার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ভোটার চা বাগান এলাকায় বসবাস করেন। অতীত নির্বাচনে দেখা গেছে, চা বাগানগুলোতে ভোটার উপস্থিতি প্রায় ৯০ শতাংশের কাছাকাছি থাকে। ফলে এই ভোটই মূলত জয়-পরাজয়ের চূড়ান্ত ফয়সালা করে। এই বাস্তবতায় যে কোনো প্রার্থীর জন্য চা শ্রমিকদের সমর্থন নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
দীর্ঘদিন ধরে মৌলভীবাজার-৪ আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। স্বাধীনতার পর থেকে একাধিক মেয়াদে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরাই এখান থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তবে এবারের নির্বাচনে দলটি সরাসরি মাঠে না থাকায় সেই ভোটব্যাংক এখন উন্মুক্ত।
এই শূন্যতা পূরণে বিএনপি,জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য দলগুলো নিজেদের মতো করে কৌশল সাজাচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপির ভেতরেই সৃষ্টি হয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন মাত্রা।
বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়ছেন জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাজী মুজিবুর রহমান চৌধুরী। তার বিপরীতে মাঠে রয়েছেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও শ্রীমঙ্গল পৌরসভার পাঁচবারের নির্বাচিত সাবেক মেয়র মো. মহসিন মিয়া মধু।
ভোটারদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, বিএনপির এই অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভোট বিভাজনের কারণ হতে পারে। তবে দুই প্রার্থীই নিজেদের শক্ত অবস্থান তুলে ধরে মাঠপর্যায়ে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছেন।
শীতের মৌসুম হলেও শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের চা বাগানগুলোতে এখন নির্বাচনি আমেজ স্পষ্ট। শ্রমিক পল্লীগুলোতে নিয়মিত উঠান বৈঠক, ছোট সভা ও গণসংযোগ চলছে। প্রার্থীরা সরাসরি শ্রমিকদের জীবনমান, মজুরি, বাসস্থান ও স্বাস্থ্যসেবার মতো বিষয়গুলো আলোচনায় আনছেন।
ভোটারদের মতে,যে প্রার্থী চা শ্রমিকদের বাস্তব সমস্যাগুলো বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরতে পারবেন,তিনিই এগিয়ে থাকবেন।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতার সুযোগ কাজে লাগাতে মাঠে সক্রিয় জামায়াতে ইসলামীও। দলটির প্রার্থী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আব্দুর রব দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিক কাজ করে আসছেন বলে দাবি করছেন নেতাকর্মীরা।
এছাড়া এনসিপির প্রার্থী প্রীতম দাশ,গণঅধিকার পরিষদের হারুন অর রশিদ,বাসদের অ্যাডভোকেট আবুল হাসান ও সিপিবির জলি পাল নিজ নিজ রাজনৈতিক অবস্থান থেকে প্রচার চালাচ্ছেন। বিশেষ করে চা শ্রমিকদের অধিকার ইস্যুতে বাম ও বিকল্প ধারার প্রার্থীরা বেশি সরব।
দুটি পৌরসভা ও ১৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৮২ হাজার ৬৪৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৪২ হাজার ৮৩৯ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৩৯ হাজার ৮০৪ জন। দুই উপজেলায় মোট ভোটকেন্দ্র রয়েছে ১৬৩টি।
স্থানীয় ভোটারদের ভাষ্য,আওয়ামী লীগ প্রার্থী না থাকায় এবার ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া আগের চেয়ে কঠিন হয়ে পড়েছে। কেউ দলীয় পরিচয়ের বাইরে ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা দেখছেন,কেউ আবার উন্নয়ন ও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
সব মিলিয়ে মৌলভীবাজার-৪ আসনে এবারের নির্বাচন শুধু দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়,বরং ভোট কাঠামো ও রাজনৈতিক বাস্তবতার বড় একটি পরীক্ষা। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে তৈরি হওয়া শূন্যতা কে কতটা পূরণ করতে পারেন,আর চা বাগানের ভোট কোন দিকে মোড় নেয়-সেই দিকেই এখন নজর সবার।

