সত্যজিৎ দাস:
ত্রেতাযুগের অযোধ্যায় এক জ্ঞানী ও প্রজাপ্রিয় রাজা ছিলেন-দশরথ। তাঁর তিন স্ত্রী কৌশল্যা, কৈকেয়ী ও সুমিত্রা। কৌশল্যার গর্ভে জন্ম নেন রাম, কৈকেয়ীর গর্ভে ভরত,আর সুমিত্রার গর্ভে লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্ন।
রাম ছিলেন বিষ্ণুর সপ্তম অবতার,কিন্তু একই সঙ্গে তিনি ছিলেন এক আদর্শ মানুষ- ন্যায়,নীতি ও আত্মসংযমের প্রতীক।
রাজা দশরথ যখন রামকে উত্তরাধিকার ঘোষণা করতে যান,তখন এক দাসীর প্ররোচনায় কৈকেয়ী ষড়যন্ত্র করেন। তাঁর দাবিতে রামকে ১৪ বছরের বনবাসে পাঠানো হয়,আর ভরতকে সিংহাসনে বসানো হয়।
তবুও রাম কখনো বিদ্রোহ করেননি। পিতার আদেশই ছিল তাঁর কাছে ধর্ম, তাই তিনি সীতা ও লক্ষ্মণকে সঙ্গে নিয়ে বনবাসে চলে যান। এই সিদ্ধান্তেই ফুটে ওঠে রামের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা-ক্ষমতা নয়,ন্যায়ের পথ বেছে নেওয়া।
পরে পুত্রবিয়োগে রাজা দশরথ মৃত্যুবরণ করেন। ভরত বুঝতে পারেন,প্রজারা রামকেই ভালোবাসে। তাই তিনি সিংহাসনে না বসে রামের প্রতীক হিসেবে তাঁর খড়ম সিংহাসনে রেখে কেবল কেয়ারটেকার হিসেবে রাজ্য পরিচালনা করেন।
বনবাসের শেষ দিকে রাবণের বোন শূর্পণখা রামকে প্রলুব্ধ করতে চেয়েছিলেন,কিন্তু রাম তাঁর প্রতিজ্ঞা ও নৈতিকতায় অটল থাকেন। অপমানের প্রতিশোধে রাবণ সীতাকে অপহরণ করে। রাম তখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন-এ যুদ্ধ ছিল ধর্মযুদ্ধ, অন্যায়ের ওপর ন্যায়ের জয়। হনুমান ও বানরসেনার সহায়তায় রাম রাবণকে পরাজিত করেন এবং ভিবীষণকে লঙ্কার রাজা করেন।
সীতা হনুমানকে বলেছিলেন-“রাম যেন নিজেই এসে আমাকে উদ্ধার করেন,তবেই তাঁর সম্মান রক্ষা পাবে।” এখানেই ফুটে ওঠে সম্মান,ভালোবাসা ও মর্যাদার এক অনন্য প্রতীক।
রাম আমাদের শেখান; নেতৃত্ব মানে ক্ষমতা নয়, দায়িত্ব। তিনি চাইলেই ষড়যন্ত্র করে সিংহাসনে বসতে পারতেন,কিন্তু জানতেন এতে ভাইদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ বাঁধবে। তাই তিনি ধৈর্য ধরেন এবং ন্যায়কে প্রাধান্য দেন। একজন নেতার মতোই তিনি লোভ-লালসা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখেন। রাবণের বোনের প্রস্তাব,রাজ্য পাওয়ার সুযোগ,এমনকি প্রতিশোধের ক্ষমতা,সবকিছুর ওপরে তিনি নৈতিকতাকে বেছে নেন।
রামের শাসনব্যবস্থা ছিল ন্যায়নিষ্ঠ, প্রজাকেন্দ্রিক ও মানবিক। তাঁর রাজ্যে অন্যায়,দুর্নীতি বা বৈষম্য ছিল না। প্রজারা সুখে থাকত,রাজা ছিলেন ন্যায়ের প্রতীক-এই আদর্শ ব্যবস্থাই “রামরাজত্ব” নামে পরিচিত।
আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় “রামরাজত্ব” শব্দটি প্রায়ই ব্যবহৃত হয়,কিন্তু অনেকেই এর প্রকৃত অর্থ জানেন না। “রামরাজত্ব” মানে কখনো স্বেচ্ছাচারিতা নয়;এর অর্থ হলো-ন্যায়পরায়ণতা, দায়িত্বশীলতা,সত্যবাদিতা ও জনগণের প্রতি ভালোবাসা।
বাংলাদেশে আজ অনেক নেতা-বক্তা কথায় কথায় বলেন “ওমুক তমুক রামরাজত্ব চালু করেছে।”
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে রামরাজত্ব শব্দটি যে নৈতিক শাসনের প্রতীক,তা তাঁরা জানেন না।
অতীতের প্রবীণ নেতারা: প্রয়াত সাইফুর রহমান, সৈয়দ মহসিন আলী,সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বা শাহ এ এম এস কিবরিয়া,কখনো এই শব্দকে বিদ্রূপে ব্যবহার করেননি। কারণ তাঁরা জানতেন রামরাজত্ব মানে হলো জনগণের কল্যাণের শাসন,অহংকারের নয়।
রাম ছিলেন এক ধর্মপ্রচারক,সমাজ সংস্কারক ও আদর্শ নেতা। তিনি আমাদের শেখান-সরকার প্রধানের প্রথম গুণ সততা,দ্বিতীয় গুণ ন্যায়,তৃতীয় গুণ মেধা। যে নেতা এসব গুণ ধারণ করেন,তার শাসনই প্রকৃত অর্থে “রামরাজত্ব”।
আজকের রাজনীতিবিদদের উচিত রামের মতো হতে চেষ্টা করা। যেখানে ক্ষমতার চেয়ে মানবতার মূল্য বেশি,আর শাসনের চেয়ে ন্যায়ের জয় সর্বোচ্চ।

