লিমন মিয়া, সরিষাবাড়ী (জামালপুর):
‘ইচ্ছেশ্রমে গড়ি দেশ, সুস্থ সুন্দর বাংলাদেশ’—এই প্রতিপাদ্যে জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলাকে ক্ষতিকর আগ্রাসী উদ্ভিদ পার্থেনিয়ামমুক্ত ঘোষণা করেছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইচ্ছেশ্রম।
সংগঠনটি ২০২২ সাল থেকে সরিষাবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিকভাবে পার্থেনিয়াম নির্মূল অভিযান পরিচালনা করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার (১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) সকালে উপজেলার আওনা ইউনিয়নের জগন্নাথগঞ্জ পুরাতন ঘাট এলাকায় সর্বশেষ অভিযান শেষে সরিষাবাড়ী উপজেলাকে পার্থেনিয়ামমুক্ত ঘোষণা করা হয়।
পার্থেনিয়াম একটি অত্যন্ত ক্ষতিকর আগ্রাসী উদ্ভিদ। এটি নরম কাণ্ডবিশিষ্ট গুল্মজাতীয় আগাছা, যা সাধারণত ‘গাজর ঘাস’ নামে পরিচিত।
দেখতে অনেকটা গাজর পাতা কিংবা চন্দ্রমল্লিকা ফুল গাছের পাতার মতো। এতে ছোট ছোট সাদা ফুল ফোটে। এর বীজ অত্যন্ত হালকা ও ক্ষুদ্র হওয়ায় বাতাসের মাধ্যমে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে এবং দ্রুত বংশবিস্তার করে।
এই উদ্ভিদের আদি নিবাস উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং পূর্ব মেক্সিকো। এর বৈজ্ঞানিক নাম Parthenium hysterophorus। সাধারণত গাছটি ২ থেকে ৫ ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়ে থাকে।
একটি গাছ মাত্র চার মাসের মধ্যে তিনবার ফুল দিয়ে প্রায় ৪ হাজার থেকে ১৫ হাজার পর্যন্ত বীজ উৎপন্ন করতে পারে, যা এর ভয়াবহ বিস্তারের অন্যতম কারণ।
স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য পার্থেনিয়াম মারাত্মক ক্ষতিকর। এর ফুলের রেণু বাতাসের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করলে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, জ্বর, অ্যালার্জি, চর্মরোগ ও ব্রংকাইটিসসহ নানা জটিল রোগের সৃষ্টি হতে পারে। গবাদিপশু এই ঘাস খেলে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার পাশাপাশি মৃত্যুর ঝুঁকিও থাকে। কৃষি ক্ষেত্রেও এর প্রভাব ভয়াবহ—ফসলি জমিতে পার্থেনিয়াম জন্মালে উৎপাদন ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
এই ক্ষতিকর প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে সরিষাবাড়ী উপজেলা জুড়ে পার্থেনিয়াম নির্মূলের উদ্যোগ গ্রহণ করেন উদ্ভিদ গবেষক ও প্রকৃতি প্রেমী সহকারী অধ্যাপক মো. হাসমত আলী। তিনি ‘দ্বিজেন শর্মা উদ্ভিদ উদ্যান ও প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণ কেন্দ্র’-এর প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর উদ্যোগেই গড়ে ওঠে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইচ্ছেশ্রম।
এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে সংগঠনটি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ৩০টিরও বেশি স্থানে পার্থেনিয়াম নির্মূল অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানের আওতায় রাস্তার পাশ, খোলা জায়গা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংলগ্ন এলাকা, ফসলি জমির আশপাশ ও জনবসতিপূর্ণ স্থান থেকে পার্থেনিয়াম অপসারণ করে তা মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়, যা পরবর্তীতে জৈবসারে পরিণত হয়।
ইচ্ছেশ্রম সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সহকারী অধ্যাপক মো. হাসমত আলী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে ছুটির দিনে তিনি এই ক্ষতিকর উদ্ভিদ নির্মূলে কাজ করে যাচ্ছেন। আজকের অভিযানের মাধ্যমে সরিষাবাড়ী উপজেলাকে পার্থেনিয়ামমুক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে পার্থেনিয়াম সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা অত্যন্ত কঠিন, কারণ বাতাসের মাধ্যমে এর বীজ যেকোনো স্থানে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবুও এই কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
এছাড়া সারা বাংলাদেশ থেকে কীভাবে পার্থেনিয়াম নির্মূল করা যায়, সে বিষয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা ও কর্মসূচি গ্রহণের আশাবাদও ব্যক্ত করেন তিনি।

