ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি:
ঘড়ির কাটা ঠিক সন্ধ্যা ৬ টা। পুরো শহরে জলমল করছে বিদ্যুতের আলোয়। ব্যবসায়ীসহ বাজারে আসা লোকজন যখন যার যার কাজে ব্যস্ত সময় ঠিক তখনই হঠাৎ করে বিদ্যুতের আলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। অন্ধকার হয়ে যায় গোটা শহর। মুহূর্তের মধ্যে এক সঙ্গে জ্বলে উঠলো শতশত প্রদীপ। এমন এক দৃশ্য শুক্রবার সন্ধ্যায় দেখা যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া পৌর শহরের সড়ক বাজার মুক্তমঞ্চ এলাকায়।
বাজারে আসা লোকজন এমন এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখে তারা চমকিয়ে উঠেন। মুহূর্তের মধ্যে এমন দৃশ্য দেখতে মুক্তমঞ্চের চারদিকে লোকের ভিড় জমে যায়। অনেকে এমন দৃশ্য দেখে ছবি ও ভিডিও করেন। প্রদীপ প্রজ্বলনের সময় ৫ মিনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়।
শনিবার ৬ ডিসেম্বর আখাউড়া মুক্ত দিবস। এ উপলক্ষে দিনটিকে স্মরণ করে রাখতে উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও আমরা মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড র্যালি ও আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচি হাতে নেয়।
এর ধারাবাহিকতায় সন্ধ্যায় শতশত প্রদীপ প্রজ্বলনের মধ্যদিয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রশাসনের কর্মকর্তা কর্মচারী, রাজনৈতিক নেতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, আমরা মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার লোকজন উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠিত সভায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাপসী রাবেয়া সভাপতিত্বে এ সময় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সৈয়দ জামশেদ শাহ, মো: বাহার মিয়া মালদার, মো: তাজুল ইসলাম, জেলা বিএনপির সদস্য আলহাজ্ব খন্দকার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক লায়ন আবুল মুনসুর মিশন আখাউড়া থানার মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড আখাউড়া উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক এস এম জিয়াউল হক খাদেম প্রমুখ।
উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক এস এম জিয়াউল হক খাদেম বলেন, মুক্ত দিবস উপলক্ষে শনিবার স্থানীয় স্মৃতিসৌধে পুস্পমাল্য অর্পণ, আনন্দ র্যালি, পোস্ট অফিসের স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করা হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৬ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালে এই দিনে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর কবল থেকে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে আখাউড়া মুক্ত হয়। বীর মুক্তিযোদ্ধারা অসীম সাহসে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন পৌর শহরের সড়ক বাজার পোস্ট অফিসের সামনে। আখাউড়া মুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা মুক্ত হতে শুরু করে।
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ঢাকায় আক্রমণ করলে সে দিন থেকেই সারাদেশে পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে।
৩০ নভেম্বর ও ১লা ডিসেম্বর আখাউড়া উত্তরে সীমান্তবর্তী আজমপুর, রাজাপুর, সিঙ্গারবিল, মিরাশানি এলাকায় আধুনিক অস্ত্রে সস্ত্রে পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মুক্তি বাহিনীর যুদ্ধ হয়। টানা ৩ দিন চলে এ যুদ্ধ। এ যুদ্ধে অন্ত:ত ৩৫ পাকিস্তানী সেনা নিহত হয়। বন্দী করা হয় ৫ জনকে। মুক্তি বাহিনীর নায়েক সুবেদার আশরাফ আলী খান এ সময় শহিদ হন। আহত হন অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে পাকিস্তানী বাহিনী দাঁড়াতে পাড়েনি। তারা তখন পিছু হটতে লাগলেন। ৩ ডিসেম্বর রাতে মুক্তিবাহিনীরা আজমপুর অবস্থান নিলে সেখানেও যুদ্ধ হয়। ওই যুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর ১১ জন সৈন্য নিহত হয়। মুক্তিবাহিনীর ২ সিপাহী ও ১ নায়েক সুবেদার শহীদ হন। ৪ ও ৫ ডিসেম্বর যুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর প্রায় ১৭০ জন সৈন্য নিহত হয়। তখন গোটা আখাউড়া এলাকা মুক্তিবাহিনীর দখলে চলে আসে। যুদ্ধে ৬ ডিসেম্বর আখাউড়া পুরোপুরি হানাদার মুক্ত হয়।

