ইংলিশ ফুটবলের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব নটিংহাম ফরেস্টের ইতিহাসের অন্যতম সেরা তারকা এবং স্কটল্যান্ডের সাবেক কিংবদন্তি ফুটবলার জন রবার্টসন আর নেই। ৭১ বছর বয়সে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) গভীর শোকের সঙ্গে ক্লাবটির পক্ষ থেকে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়।
নটিংহাম ফরেস্টের স্বর্ণযুগের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন এই বাঁ উইঙ্গার। ১৯৭৯ ও ১৯৮০ সালে ফরেস্টের টানা দুইবার ইউরোপিয়ান কাপ (বর্তমান চ্যাম্পিয়নস লিগ) জয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন জন রবার্টসন। তার অসাধারণ ফুটবল নৈপুণ্য ও শৈল্পিক স্পর্শের কারণে ক্লাবটির কিংবদন্তি কোচ ব্রায়ান ক্লফ তাকে আখ্যায়িত করেছিলেন— ‘ফুটবল মাঠের পিকাসো’ নামে।
নটিংহাম ফরেস্ট তাদের শোকবার্তায় জানিয়েছে, জন রবার্টসন কেবল একজন মহান ফুটবলারই ছিলেন না, তিনি ছিলেন ক্লাবের আত্মার অংশ। ১৯৭৯ সালের ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনালে সুইডিশ ক্লাব মালমোর বিপক্ষে তার নিখুঁত ক্রস থেকেই ট্রেভর ফ্রান্সিস জয়সূচক গোলটি করেছিলেন।
এর পরের বছর, ১৯৮০ সালে জার্মান ক্লাব হামবুর্গের বিপক্ষে ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনালে নিজেই গুরুত্বপূর্ণ গোল করে ফরেস্টকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ইউরোপ সেরার মুকুট এনে দেন রবার্টসন। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টাইমস তাকে নটিংহাম ফরেস্টের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
ক্লাবের বিবৃতিতে তার অতুলনীয় প্রতিভা, বিনয়ী চরিত্র ও দলের প্রতি নিঃস্বার্থ নিবেদন গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়েছে। তার মৃত্যুতে নটিংহাম, স্কটল্যান্ড এবং বিশ্ব ফুটবলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
স্কটল্যান্ড জাতীয় দলের জার্সিতেও জন রবার্টসনের অবদান স্মরণীয়। পাঁচ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে তিনি ২৮ ম্যাচে ৮টি গোল করেন। এর মধ্যে ১৯৮১ সালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়সূচক গোল এবং ১৯৮২ বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে করা গোলটি আজও ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। তবে তার ক্লাব ক্যারিয়ারই ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আলোচিত।
মাত্র ১৭ বছর বয়সে, ১৯৭০ সালে নটিংহাম ফরেস্টে যোগ দেন জন রবার্টসন। ১৯৭৫ সালে ব্রায়ান ক্লফ দায়িত্ব নেওয়ার পর তার ক্যারিয়ারে আসে আমূল পরিবর্তন। ক্লফ তাকে মাঝমাঠ থেকে সরিয়ে বাঁ উইংয়ে খেলান—যে সিদ্ধান্ত ফরেস্টের ইতিহাস বদলে দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালে ইংলিশ লিগ এবং পরবর্তীতে টানা দুইবার ইউরোপিয়ান শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে ক্লাবটি।
কোচ ক্লফের সবচেয়ে বিশ্বস্ত শিষ্যদের একজন ছিলেন রবার্টসন। ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৮০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা ২৪৩টি ম্যাচ খেলেন তিনি, যা তার ফিটনেস ও দলের ওপর গুরুত্বের প্রমাণ। ব্রায়ান ক্লফ একসময় মন্তব্য করেছিলেন, রবার্টসনের ক্রস দেওয়ার দক্ষতা ব্রাজিলীয় কিংবা ইতালীয় ফুটবলারদের মতোই নিখুঁত ও নান্দনিক।
ফরেস্টের হয়ে নিজের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে তিনি ৪৯৯ ম্যাচে ৯৫টি গোল করেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি পারকিনসনস রোগে ভুগছিলেন। তার মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নটিংহাম ফরেস্ট সমর্থকরা আবেগঘন বার্তায় লিখছেন— ‘শান্তিতে ঘুমাও, রোবো’।
ফুটবল ইতিহাসের এক শৈল্পিক অধ্যায়ের এখানেই পরিসমাপ্তি ঘটল। তবে জন রবার্টসনের নাম ও তার ফুটবলীয় সৌন্দর্য চিরকাল বেঁচে থাকবে মাঠে-মাঠে, স্মৃতিতে ও ইতিহাসের পাতায়।

