জাবেদ শেখ, শরীয়তপুর প্রতিনিধি:
শরীয়তপুরে শীতকালীন ফসলের মৌসুমে কৃষকেরা মাঠে ব্যস্ত। মিষ্টি আলু, কালোজিরা, ধনিয়া, রসুন, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন শাকসবজি চাষ শুরু হয়েছে জোরেশোরে। কিন্তু এ ভরা মৌসুমে জেলায় দেখা দিয়েছে সারের সংকট। বরাদ্দের তুলনায় চাহিদা বেশি হওয়ায় কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে।
শরীয়তপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী জেলার সর্বমোট প্রায় ৮২,৫০০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ফসল চাষ করেন কৃষকরা। শীতকালীন সবজি, আলু, রসুন, রবিশস্য আবাদ এসময় প্রধানভাবে হচ্ছে। কিন্তু সারের বরাদ্দ কম থাকায় অনেক কৃষক বাড়তি খরচে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী, প্রতি কেজি ইউরিয়া ২৭ টাকা, টিএসপি ২৭ টাকা, ডিএপি ২১ টাকা এবং পটাশ ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ৭১ জন ডিলার নিয়োগ দিয়েছে।
সদর উপজেলার ডোমসার ইউনিয়নের চর ডোমসার মোল্লা কান্দির কৃষক ফরহাদ মোল্লা (৬০) বলেন-
৭২ শতাংশ জমিতে সরিষা, ধনে পাতা ও কলাই চাষ করছি। ইউরিয়ার দাম গতবার ১,৩০০ টাকা ছিল, এবার ১,৫০০ টাকায় বস্তা কিনতে হচ্ছে। টিএসপি ১,৪০০ থেকে বেড়ে ১,৭০০ টাকা বস্তা, পটাশ আগের মতো ১,০০০ টাকায় আছে। শুনেছি, বরাদ্দ কম থাকায় দাম বেড়েছে।
নড়িয়ার নশাসন ইউনিয়নের গাগ্রিজোরা গ্রামের কৃষক আব্দুল রহিম খান (৬৭) বলেন-
আমার জমিতে মিষ্টি আলু, কালোজিরা, ধনিয়া, রসুন ও পেঁয়াজ আবাদ করেছি। ৪০ শতাংশ জমিতে প্রায় ৮০ কেজি সার লাগে। প্রতি কেজি টিএসপি কিনতে হচ্ছে ৩৫ টাকা, পটাশ ২৩ টাকা, ইউরিয়া ৩০ টাকা। যা সরকার নির্ধারিত মূল্য ও গত বছরের থেকে বাড়তি।
একই গ্রামের দেলোয়ার শেখ (৫২) জানান-
৮০ শতাংশ জমির মধ্যে ৪০ শতাংশে কালোজিরা, ২০ শতাংশে ধনিয়া, ২০ শতাংশে সরিষা চাষ করেছি। প্রয়োজন ২০০ কেজি সার। টিএসপি কেজি ৩৬, ইউরিয়া ৩২ ও পটাশ ২০ টাকা দরে কিনেছি। সারের দাম বাড়লেও কিন্তু ফসলের দাম বাড়ছে না।
ঘোষ এন্টারপ্রাইজের ডিলার রাম কৃষ্ণ ঘোষ বলেন-
কৃষকেরা প্রায়ই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার ব্যবহার করেন। এতে চাহিদা বাড়ে। তবে আমরা সরকারি নির্ধারিত দামে সার বিক্রি করি। বরাদ্দ কম থাকায় কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে।
সাব-ডিলার সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা যোগ করেন,
চাহিদা বেশি, বরাদ্দ কম থাকার কারণে সাময়িক সমস্যার দেখা দিয়েছিল। এখন পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক। সরকারি দামে সার সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। আমরাও সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি করছি।
জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী
তিন মাসের (অক্টোবর–ডিসেম্বর) চাহিদা ও বরাদ্দের হিসাবে দেখা যায়,
ইউরিয়া: চাহিদা ১৬,২৬১ টন, বরাদ্দ ৬,৯৭২ টন
টিএসপি: চাহিদা ৩,৯৩৯ টন, বরাদ্দ ১,৪৪৭ টন
এমওপি/পটাশ: চাহিদা ৭,৬০০ টন, বরাদ্দ ১,৮৯২ টন।
শরীয়তপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জয় কুণ্ড বলেন,
বরাদ্দ কম হলেও উপজেলা-ওয়ারি সমন্বয়ের মাধ্যমে সার বিতরণ করা হচ্ছে। কৃষকরা যদি সুষম সার প্রয়োগ করতেন, চাহিদা কিছুটা কম হত। আমরা বরাদ্দ পাওয়া সার সব ডিলারের মধ্যে সমানভাবে বিতরণ করি।
শরীয়তপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক রফিকুল ইসলাম বলেন-
জেলায় এ মৌসুমে সারের চাহিদা বেড়েছে, কিন্তু বরাদ্দ তা অনুযায়ী না থাকায় মাঠপর্যায়ের কৃষকেরা কিছুটা চাপের মুখে পড়েছেন। অনেক কৃষক প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে বিকল্প উপায়ে মাটির উর্বরতা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন, কেউ কেউ আবার অতিরিক্ত দাম দিয়ে হলেও সার সংগ্রহে বাধ্য হচ্ছেন।
তিনি আরও জানান-
অতিরিক্ত মূল্য আদায়, মজুতদারি এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে বাজার মনিটরিং কার্যক্রম নিয়মিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে, পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা অনৈতিক কাজ থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হচ্ছে।
রফিকুল ইসলাম আরো বলেন-
কৃষকদের সঠিক সময়ে সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও ডিলারদের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় সভা করা হচ্ছে, যাতে শীতকালীন ফসল উৎপাদনে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে।
শরীয়তপুরে শীতকালীন মৌসুমে সারের সংকট কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত বরাদ্দ বৃদ্ধি, সঠিক সময়ে ডিলার পয়েন্টে সার পৌঁছে দেওয়া এবং বাজারে অনিয়ম ঠেকাতে কঠোর নজরদারি আরও জোরদার করা জরুরি। সার সংকট নিরসনে প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও ডিলারদের সমন্বিত উদ্যোগই এখন সবচেয়ে জরুরি এমনটাই মনে করছেন জেলার সাধারণ মানুষ ও কৃষকেরা।

