ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি:
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলায় আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বছরজুড়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে সবজির আবাদ। কৃষি অফিসের পরামর্শে বানিজ্যিকভাবে কৃষকরা শীতকালীন শিম, টমেটো, বেগুন, করলা, লাউ, মুলা, ফুলকপি, বাঁধাকপিসহ নানা জাতের সবজি চাষ করেছেন। এখন সবজির ভরা মৌসুম হওয়ায় স্থানীয় হাট বাজারে সবজির সরবরাহ বেশ বেড়েছে। সর্বত্র হাট বাজারে জমজমাট হয়ে উঠেছে সবজি বিক্রি।
কিন্তু কাঙ্খিত দর পাচ্ছে না প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের উৎপাদিত বেশীভাগ সবজি পাইকারদের কাছে বিক্রি করছেন। তারা যে দরে ক্রয় করছেন সেটা হাত বদলে খুচরা পর্যায়ে প্রায় দ্বিগুন বেড়ে যায়। যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে টাটকা সবজি পাওয়া যাচ্ছে ওইসব সবজির দাম বাড়লেও কৃষকরা প্রতিনিয়ত ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। লাভের টাকার পুরোটাই ঢুকছে মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে চলে যাচ্ছে। একাধিক প্রান্তিক কৃষকের সাথে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া যায়।
উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, এ উপজেলায় প্রায় ৪৫০ হেক্টর জমিতে শীতকালীন নানা প্রজাতির সবজি চাষের লক্ষ মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। সরকার কৃষি প্রণোদনা হিসাবে কৃষকদের মাঝে মানসম্পন্ন বীজ ও সারসহ অন্যান্য উপকরণ দিয়েছে। বাজারে এসব সবজির প্রচুর চাহিদা রয়েছে। কীটনাশক মুক্ত ওইসব শাক সবজি নিরাপদ ও বালাই মুক্ত হওয়ায় স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাইকাররা নিয়ে বিক্রি করছেন।
এদিকে উপজেলার সর্বত্র হাট বাজারে মৌসুমি সবজিতে সরগরম থাকলেও ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না কৃষকরা। কৃষক থেকে ক্রেতার হাত পর্যন্ত আসতেই এসব পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে।
একাধিক কৃষককের সাথে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার আশপাশের স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পাইকাররা গ্রামে গিয়ে জমি থেকে উৎপাদন হওয়া নানা প্রকারের সবজি ক্রয় করে খুচরা বাজারে কেজিতে প্রায় ১০-২০ টাকা বাড়তি দামে বিক্রি করছেন। অনেক কৃষক আবার তাদের উৎপাদিত সবজি স্থানীয় বাজারে বসে থেকে ভালো দরে বিক্রি করছেন।
সরেজমিনে পৌর শহরের সড়ক বাজারে সবজি বাজারে গিয়ে দেখা যায়, খুচরা বিক্রেতারা প্রতিকেজি প্রতিকেজি শিম ৬০-৬৫ টমেটো ৭০-৮০ , ফুলকপি ৩০-৩৫, পাতাকপি ৩০-৩৫,করলা ৬০-৬৫, বেগুন ৩০-৩৫, পেপে ৩০-৩৫ মুলা ৩০-৩৫ লাউ প্রতি পিচ ৫০-৬০, গাজর ৪০-৪৫ কাঁচা মরিচ ৮০-৯০, খিরা ৩৫-৪০,মিষ্টি কুমড়া ৪০-৪৫ কেজি বিক্রি হচ্ছে।
কৃষক মো: মান্নান মিয়া বলেন, এ মৌসুমে ২ বিঘা জমিতে টমেটো,বেগুন, ফুলকপি, মুলা,ও লাল শাখ চাষ করেছি। নিজের লোকজন না থাকায় বাজারে বসে বিক্রি করতে পারছি না।
বেশীভাগ সবজি পাইকারদের কাছে বিক্রি করছি। বাজারে বসে বিক্রি করলে ভালো দর পাওয়া যেতো। পাইকারিতে প্রতিপিচ পাতাকপি-ফুলকপি ২০-২২ টাকা, টমেটো ৫০-৫৫ টাকা আর মুলা ১২-১৫ টাকা শসা ১৫-১৮ কেজিতে বিক্রি করছি। এরপর তারা খুচরা বাজারে কেজি প্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা বেশীতে বিক্রি করছেন। আমরা পাইকারদের কাছে যে দরে সবজির বিক্রি করছি এখন খরচের টাকা উঠানো খুবই কষ্টকর হবে।
কৃষক মো: নায়েব আলী বলেন,১০ শতক জায়গায় পাতাকপি চাষ করেছি। ফলনও বেশ ভালো রয়েছে। আশা করছি আগামী সপ্তাহে বাজারে বিক্রি করতে পারব। বর্তমান বাজারে প্রতিপিচ ফুলকপি খুচরায় ৩০-৩৫ টাকা বিক্রি হলেও পাইকাররা ২০ টাকার বেশী দর বলছে না। এ দরে বিক্রি হলে লোকসান গুনতে হবে।
কৃষক আব্দুস সালাম বলেন, এ মৌসুমে ৫০ শতাংশ জমিতে ফুলকপি,লাউ, ধনিয়াপাতা, মুলা চাষ করেছি। কৃষি অফিস সার্বিকভাবে সহযোগিতা করে। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো থাকায় বেশীভাগ সবজি পাইকারিতে বিক্রি করছি। এতে দর কম পাচ্ছি। কোন উপায় না পেযে গত কয়েক দিন ধরে ফুলকপি মুলা আর ধনিয়া পাতা লাউ বাজারে বসে বিক্রি করছি। এতে ভালো দর পাচ্ছি। ওইসব সবজি যদি সব সময় স্থানীয় বাজারে খুচরা বিক্রি করা যেতো তাহলে দ্বিগুন লাভবান হতাম।
কৃষক বাচ্চু মিয়া বলেন, নানা প্রতিকুলতা অপেক্ষা করে ফুলকপি মুলা আর ধনিয়া পাতা বেগুন চাষ করেছি। নিজে বসে বিক্রি করতে না পারায় পাইকারদের কাছে বিক্রি করছি। আজকে বাজারে ৪০ পিচ ফুলকপি আনা হয়। অনেক কষ্টে পাইকারিতে প্রতিপিচ ফুলকপি ১৫ টাকা করে বিক্রি করেছি। চোখের সামনে তারা খুচরায় বিক্রি করছে ৩০ টাকার উপর। খুচরায় বাজারে বিক্রিতে সময় বেশী লগার কারণে বাধ্য হয়ে পাইকারিতে বিক্রি করতে হয়।
খুচরা বিক্রেতা বাবুল মিয়া বলেন, আমি একা মানুষ সব সময় কৃষকের কাছ থেকে সবজি ক্রয় করতে পারি না। তাই আড়ৎ থেকে মাল ক্রয় করে ব্যবসা করছি। প্রতিদিনই সেখানে নিত্যপণ্যের দাম উঠা না করে। তারা যদি দাম বেশী রাখে তাহলে আমরাও বেশী দামে বিক্রি করি। তাছাড়া দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিলসহ অন্যান্য খরচ অনেক আছে। তাই বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ী মহসিন মিয়া বলেন, কৃষক পর্যায় থেকে সবজি ক্রয় করা খুবই কষ্টের কাজ। এক কৃষকের কাছে চাহিদানুযায়ী সব পণ্য পাওয়া যায় না। তাই ভোর থেকেই বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে এসব সংগ্রহ করতে হয়। তিনি আরও বলেন কৃষকের কাছ থেকে কেনা ওইসব পণ্য কেজিতে স্বল্প লাভে স্থানীয় খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা হয়। আর হাত বদলে দাম কিছুটা বেড়ে যায় বলে জানায়।

