সত্যজিৎ দাস (মৌলভীবাজার প্রতিনিধি):
দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত এশিয়ান ইয়ুথ প্যারা গেমস ২০২৫-এ ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন বাংলাদেশের ১৩ বছর বয়সী প্যারা অ্যাথলেট চৈতী রানী দেব। জ্যাভলিন থ্রো ও ১০০ মিটার স্প্রিন্ট-এই দুই ইভেন্টে স্বর্ণপদক জিতে তিনি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যই অর্জন করেননি,বরং বাংলাদেশের প্যারালিম্পিক ইতিহাসে এক অনন্য গৌরবের অধ্যায় যোগ করেছেন।
গত শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) এফ-৪০ শ্রেণির জ্যাভলিন থ্রো ইভেন্টে ৯.৪৫ মিটার দূরত্বে বর্শা নিক্ষেপ করে প্রথমে ব্রোঞ্জ পদকের ঘোষণা আসে। তবে ফলাফল পুনর্বিবেচনার পর সেটি পরিবর্তিত হয়ে স্বর্ণপদকে রূপ নেয়। পাশাপাশি ১০০ মিটার দৌড় ইভেন্টেও তিনি স্বর্ণ জয় করেন। এক আসরে দুটি স্বর্ণপদক- চৈতীকে পরিণত করেছে বাংলাদেশের অন্যতম সফল ইয়ুথ প্যারা অ্যাথলেটে।
চৈতী রানী দেব মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভূনবীর ইউনিয়নের ভুনবীর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ভূনবীর দশরথ উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। উচ্চতায় মাত্র তিন ফুট সাত ইঞ্চি হলেও তার অদম্য মনোবল ও কঠোর পরিশ্রম তাকে পৌঁছে দিয়েছে এশিয়ার সেরার কাতারে।
সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) রাতে নিজ গ্রামে ফেরার পর থেকেই এলাকায় আনন্দের বন্যা বইছে। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ,শিক্ষক,শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর উদ্যোগে তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্পোর্টস ফর হোপ অ্যান্ড ইন্ডিপেন্ডেন্স (এসএইচআই)-এর ক্রীড়া প্রশিক্ষক দেব প্রসাদ শীলসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
চৈতীর বাবা সত্য দেব আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন,
“আমার প্রতিবন্ধী মেয়ে আজ দেশের জন্য আন্তর্জাতিক মঞ্চে পদক জিতেছে-এ আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সবাই আমার মেয়ের জন্য দোয়া করবেন।”
বিদ্যালয়ের শিক্ষক ঝলক চক্রবর্তী বলেন,
“চৈতী রানী দেব আমাদের বিদ্যালয়ের গর্ব। তার এই সাফল্য শুধু স্কুল বা এলাকার নয়,পুরো দেশের প্যারালিম্পিক অগ্রযাত্রার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।”
চৈতী নিজে বলেন,“এই অর্জন আমি দেশবাসী ও এলাকাবাসীকে উৎসর্গ করছি। সামনে জাপানে দেশের হয়ে খেলতে যাব। সবাই দোয়া করবেন যেন আবারও দেশের পতাকা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে পারি।”
চৈতীর প্রশিক্ষক দেব প্রসাদ শীল বলেন,“প্রথম দেখাতেই বুঝেছিলাম ওর ভেতরে সাফল্যের ক্ষুধা আছে। চৈতী অন্যদের মতো নয়-সে আরও শক্ত। একটানা দেড় ঘণ্টার কাছাকাছি জগিং করতে পারে। অল্প সময়ের প্রশিক্ষণেই জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে,আর এখন এশিয়ার মঞ্চে দুটি স্বর্ণ জিতে দেশকে গৌরবান্বিত করেছে।”
উল্লেখ্য,এশিয়ান ইয়ুথ প্যারা গেমসে বাংলাদেশ দল মোট তিনটি স্বর্ণ ও দুটি ব্রোঞ্জসহ পাঁচটি পদক অর্জন করেছে। চৈতী রানী দেব ও সাঁতারু শহিদুল্লাহ এই সাফল্যের প্রধান কারিগর। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পদকজয়ী ক্রীড়াবিদদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান আমিরাতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও কনসাল জেনারেল।
শ্রীমঙ্গলের প্রান্তিক জনপদ থেকে উঠে আসা এই কিশোরী আজ প্রমাণ করেছে-শারীরিক সীমাবদ্ধতা নয়,অদম্য সাহস আর পরিশ্রমই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। চৈতী রানী দেব এখন বাংলাদেশের গর্ব, অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল নাম।

