আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে বিএনপি তাদের নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করতে যাচ্ছে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানকে সামনে রেখে শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে এই ঘোষণা করবেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। অনুষ্ঠান শুরু হবে বিকেল সাড়ে ৩টায়, সভাপতিত্ব করবেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং সঞ্চালনা করবেন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান।
ইশতেহারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপ, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সঠিক তালিকা প্রণয়ন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিচার কার্যকর করার মতো বিষয়গুলোতে। দলীয় সূত্রে জানানো হয়েছে, ইশতেহার প্রস্তুত করা হয়েছে বিএনপির ‘রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফা’, প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ‘১৯ দফা’, বেগম খালেদা জিয়ার ‘ভিশন-২০৩০’ এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর সংমিশ্রণে।
এবারের ইশতেহারে সামাজিক নিরাপত্তা, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি ও শিক্ষা খাত, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, পরিবেশ, প্রতিরক্ষা, আন্তর্জাতিক নীতি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ নানা বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো—স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ এবং ‘ই-হেলথ কার্ড’ প্রবর্তন। মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য এবং জটিল রোগের আধুনিক চিকিৎসায় পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) মডেল গড়ে তোলা। তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে আইটি পার্কে সুবিধা, ফ্রি ওয়াইফাই জোন, আউটসোর্সিং ও ক্ষুদ্র-মধ্যম শিল্পে সহজ ঋণ, আন্তর্জাতিক ই-কমার্স সংযোগ এবং স্টার্ট-আপ ফান্ড। মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে ‘জব ম্যাচিং’ সেবা। শিক্ষাখাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ, উচ্চমানের শিক্ষা সংস্কার কমিশন, আন্তর্জাতিক চাহিদা অনুযায়ী পাঠ্যক্রম, বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস, শতভাগ সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও স্কুলে স্বাস্থ্য সামগ্রী এবং ‘ভেন্ডিং মেশিন’ স্থাপন। প্রাথমিক শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মীদের বেতন কাঠামো উন্নয়ন ও কল্যাণমূলক কর্মসূচি।
অর্থনীতি ও অবকাঠামোতে বিএনপি ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে—বিদেশি কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য আগামী ৫ বছরে এক কোটি মানুষ পাঠানোর কার্যকর ব্যবস্থা। পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবেলায় ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং ‘সবুজ কর্মসংস্থান’ সৃষ্টির উদ্যোগ।শিল্পকারখানার বর্জ্য ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ। স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক করার জন্য উন্মুক্ত ‘উন্নয়ন জনসভা’ আয়োজন।প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ ও আধুনিক সশস্ত্র বাহিনী গঠন। পুঁজিবাজারে অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্তে ‘বিশেষ তদন্ত কমিশন’ গঠন।বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা।ডিজিটাল অর্থনীতি ও তথ্যপ্রযুক্তিতে অন্তত ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি।গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন, যানজট নিরসন ও সাইকেল-ভিত্তিক রাইড শেয়ারিং।রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কার ও রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করা। বেসরকারি খাতের কর্মীদের সামাজিক নিরাপত্তা ও বার্ধক্যকালীন পেনশন ফান্ড। নদী ও খাল পুনঃখনন, জলাশয় পুনরুদ্ধার ও সেচ সুবিধা বৃদ্ধি।ধর্মীয় নেতাদের সরকারি সম্মানী ও উৎসব ভাতা, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ সকল উপাসনালয়ের প্রধানদের জন্য মাসিক ভাতা।ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা এবং ‘নৃগোষ্ঠী উন্নয়ন অধিদপ্তর’ গঠন।
ইশতেহারে জনগণের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধ রোধ করা, আইন প্রণয়ন ও বিচার প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’ নীতির বাস্তবায়নেও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
সংক্ষেপে, বিএনপির ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ ইশতেহার আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের সকল খাতের উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা, শিক্ষাব্যবস্থা ও অর্থনীতির সর্বাঙ্গীণ পরিকল্পনা তুলে ধরেছে।

