সৈয়দ আমিরুজ্জামান
“আমার অরণ্য মাকে কেউ যদি কেড়ে নিতে চায়, আমার সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করে কেউ যদি অন্য সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়, আমার ধর্মকে কেউ যদি খারাপ বা অসভ্য ধর্ম বলে, আমাকে কেউ যদি শুধু শোষণ করে নিতে চায় তবে আমি বিদ্রোহ করবই।”
— বিরসা মুণ্ডা
ভারতের উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের ইতিহাসে যে ক’জন নেতার নাম উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো দীপ্ত, তাঁদের মধ্যে বিরসা মুণ্ডা নিঃসন্দেহে অন্যতম। বাঙালি বা ভারতীয় মূলধারার জাতীয়তাবাদী ইতিহাসে তাঁর নাম অনেক সময়ই অবহেলিত থেকেছে, কিন্তু আদিবাসী সমাজ তাঁকে আজও ‘ভগবান বিরসা’ বলে মানে—যিনি অত্যাচার, শোষণ, ভূমিচ্যুতি, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও ধর্মান্তর চাপানোর বিরুদ্ধে এক মহামানবীয় প্রতিরোধের প্রতীক।
১৮৭৫ সালের ১৫ নভেম্বর ছোট নাগপুরে জন্ম নেওয়া বিরসা মুণ্ডার জীবনের সময়কাল মাত্র ২৫ বছর হলেও তাঁর সংগ্রাম আদিবাসীদের অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়। আজ তাঁর ১৫০তম জন্মবার্ষিকীতে, তাঁর জীবন, সংগ্রাম ও দৃষ্টিভঙ্গি নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
মুণ্ডা সমাজে শোষণের নতুন অধ্যায়
ব্রিটিশ শাসনের আগেই ছোট নাগপুর অঞ্চলের আদিবাসী সমাজ তাদের বনজীবন, কৃষি, কমিউনাল জমির মালিকানা ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর প্রথমেই আঘাত আসে তাদের ভূমি ব্যবস্থায়। আদিবাসীদের নিজস্ব ‘খুঁটখুঁটি’ বা কমিউনিটি মালিকানার জমি দখল করতে শুরু করে নবাগত জমিদার, দালাল ও মহাজনরা।
একদিকে জমি খসিয়ে নেওয়া, অন্যদিকে অতিরিক্ত খাজনা—এ দুয়ের চাপে মুণ্ডাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে খ্রিস্টান মিশনারিরা ‘সভ্যতা ও ধর্মান্তর’–এর নামে আদিবাসীদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে অপমানিত করতে থাকে। আদিবাসীরা নালিশ জানালেও ঔপনিবেশিক প্রশাসন তাদের অভিযোগ শুনত না। এমন পরিস্থিতিতেই যুবক বিরসা মুণ্ডা উপলব্ধি করতে পারেন যে, ঔপনিবেশিক শোষণ থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রয়োজন সংগঠিত প্রতিরোধ।
বিরসার উদ্ভব: ধর্মীয় ও রাজনৈতিক জাগরণ
বয়সে তরুণ হলেও বিরসা ছিলেন প্রখর নেতৃত্বগুণ ও অসাধারণ সংগঠক ক্ষমতার অধিকারী। তিনি মুণ্ডা সমাজকে বলেছিলেন—
“আমি তোমাদের নতুন ধর্ম শেখাব, তোমাদের মরতে আর মারতে শেখাব।”
এ নতুন ধর্ম ছিল প্রকৃত অর্থে মুক্তির ধর্ম—যেখানে ছিল আত্মমর্যাদা, সংস্কৃতি রক্ষা, ভূমির অধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার আহ্বান। তাঁর অনুসারীরা পরিচিত হতে থাকে ‘বিরসাইত’ নামে।
১৮৯৫ সালে তাঁর ক্রমবর্ধমান প্রভাব দেখে ব্রিটিশ প্রশাসন তাঁকে দুই বছরের জন্য কারারুদ্ধ করে। কিন্তু কারাগার তাঁকে আরও দৃঢ় করে তোলে। মুক্তি পাওয়ার পর বিরসা শুরু করেন আরও সংগঠিত প্রস্তুতি—যা পরিণত হয় আদিবাসী ইতিহাসের গৌরবময় বিদ্রোহ ‘উলগুলান’–এ।
উলগুলান: ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে মহাবিদ্রোহ
১৮৯৯-১৯০০ সালের মুণ্ডা বিদ্রোহ বা ‘উলগুলান’ ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, জমিদারি শোষণ, মহাজনি লুণ্ঠন ও ধর্মান্তরের বিরুদ্ধে এক গণঅভ্যুত্থান।
বিদ্রোহের প্রধান কারণ ছিল—
ভূমির মালিকানা থেকে আদিবাসীদের উচ্ছেদ,
সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় নিপীড়ন,
খাজনা ও করের শোষণ,
সাংস্কৃতিক দমন ও মিশনারি চাপ।
বিরসার নির্দেশে মুণ্ডারা বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, থানা, মিশনারি ও জমিদার বাড়িতে আক্রমণ চালিয়ে শোষণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়।
১৮৯৯ সালের বড়দিনে রাঁচি ও সিংভূম অঞ্চলের বেশ কিছু গির্জায় অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করা হয়। এরপর জানুয়ারিতে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে থানা ও সরকারি কার্যালয়ে। ইতোমধ্যে গুজব ছড়ায়—৮ জানুয়ারি রাঁচি আক্রমণ করা হবে। ব্রিটিশ প্রশাসন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
গ্রেপ্তার, ষড়যন্ত্র ও মৃত্যুর রহস্য
১৯০০ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বিরসা মুণ্ডা গ্রেপ্তার হন। তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ ও ব্রিটিশ হত্যার অভিযোগ আনা হয়। বিচার শেষে তাঁর ফাঁসির নির্দেশ দেওয়া হলেও, এর আগেই ১৯০০ সালের ৯ জুন রহস্যজনকভাবে রাঁচি জেলেই তাঁর মৃত্যু ঘটে।
ব্রিটিশ সরকার দাবি করে এটি ‘কলেরা’, কিন্তু আদিবাসীরা দৃঢ়ভাবে মনে করে—খাদ্যে বিষপ্রয়োগেই তাঁকে হত্যা করা হয়।
বিরসার মৃত্যু ২৫ বছরের এক জীবনের ইতি টানলেও তাঁর বিদ্রোহ থামানো যায়নি। তাঁরই সংগ্রামের ফলে পরবর্তী সময়ে ‘মুণ্ডা রায়তীর অধিকার’ আইন প্রণয়ন করতে বাধ্য হয় ব্রিটিশ সরকার।
বিরসার লক্ষ্য ও দৃষ্টিভঙ্গি
বিরসা মুণ্ডার পুরো সংগ্রামকে কয়েকটি মূলভিত্তির দিকে সীমাবদ্ধ করা যায়—
১. ধর্মীয় স্বাধীনতা
আদিবাসীদের নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাসকে ‘অসভ্য’ বা ‘নিম্ন’ হিসেবে দেখার বিরোধিতা।
২. ভূমির ওপর অধিকার
‘জমির প্রকৃত মালিক মুণ্ডা সমাজ’—এই নীতি প্রতিষ্ঠা ছিল তাঁর আন্দোলনের অন্যতম মূলমন্ত্র।
৩. রাজনৈতিক মুক্তি
তিনি বিশ্বাস করতেন—ইউরোপীয় শাসনমুক্ত পৃথিবীতেই আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
৪. মুণ্ডা রাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন
শোষণমুক্ত, আত্মনিয়ন্ত্রিত স্বায়ত্তশাসিত এক সমাজব্যবস্থার কল্পনা করেছিলেন তিনি।
বিরসা মুণ্ডা ও সাহিত্য
এ মহান সংগ্রামীর জীবন ও আদর্শ নিয়ে বহু গবেষণা, নাটক, উপন্যাস রচিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে মহাশ্বেতা দেবীর কালজয়ী উপন্যাস ‘অরণ্যের অধিকার’ বিরসা মুণ্ডার জীবনকে কেন্দ্র করেই লেখা—যা আদিবাসী আন্দোলনের এক মহাগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।
আজকের প্রেক্ষাপটে বিরসা মুণ্ডা
অর্থনৈতিক শোষণ, ভূমি দখল, বনভূমি উচ্ছেদ, পরিবেশ ধ্বংস, কর্পোরেট আগ্রাসন এবং সাংস্কৃতিক পরাধীনতার যে সংকট আজও দক্ষিণ এশিয়ার আদিবাসী সমাজকে ঘিরে রেখেছে, সেখানে বিরসা মুণ্ডার সংগ্রাম নতুন প্রেরণার উৎস।
তিনি শিখিয়েছেন—
নিজের অস্তিত্ব, সংস্কৃতি, ভূমি ও মর্যাদার জন্য লড়াই করা মানুষের অধিকার এবং প্রয়োজন।
উপসংহার
ব্রিটিশ কামান-বন্দুকের সামনে তীর-ধনুক হয়তো টিকতে পারেনি, কিন্তু বিরসা মুণ্ডা আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর মনে জাগিয়ে দিয়েছেন আত্মমর্যাদার আগুন, স্বাধীনতার স্বপ্ন এবং শোষণবিরোধী সংগ্রামের চেতনা। তাঁর বিদ্রোহ আজও ইতিহাসে অম্লান—অত্যাচারিত মানুষের প্রতিরোধের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে।
১৫০তম জন্মবার্ষিকীতে আমরা এই মহান সংগ্রামী, আদিবাসী গৌরব, ব্রিটিশবিরোধী মহাবিপ্লবী বিরসা মুণ্ডার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও লাল সালাম জানাই।

